Ekattor Kantho Logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
শিরোনাম
চার সমুদ্রবন্দরে সংকেত ৩, সারাদেশে বৃষ্টির সম্ভাবনা সৌদি প্রবাসীদের জন্য চলতি মাসেই বিমানের বিশেষ ফ্লাইট ভোলায় ইয়াবা ট্যাবলেটসহ মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ভোলায় বাংলাদেশ মানব কল্যাণ ফাউন্ডেশন (বিএমএফ)'র বৃক্ষরোপন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত। পাপুল কুয়েতের নাগরিক হলে এমপি পদ বাতিল: প্রধানমন্ত্রী দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৪৮৯ জনের করোনা শনাক্ত ভোলার ৬কেজি মাদকদ্রব্য গাজা সহ এক বৃদ্ধ মহিলা গ্রেফতার কালিশুরী-ধূলিয়া ব্রীজের দুই পাশের সংযোগ সড়ক মরণ ফাঁদে পরিনত ভোলায় ২ বছরের শিশুকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার মা সাংবাদিক আজাদের বিরুদ্ধে দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকায় মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের প্রতিবাদে দৌলতখানে মানববন্ধন

সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি


একাত্তর কন্ঠ

আপডেট সময়: ১১ জুন ২০১৯ ৯:৩৮ পিএম:
সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি

শাহীন কামাল: গ্রামেই জম্ম আমার। অজপাড়া গাঁ যাকে বলে। প্রকৃতির আলো আঁধার, নির্মল বাতাস আর কাঁদা মাটি হৃদয়ের মানুষের স্নেহ মমতায় বড় হয়েছি। ঈদ পার্বণের স্মৃতিগুলো এতদিনেও মলিন হয়ে যায়নি বরং মনের কোটরে উঁকি দেয় নিরবে নিভৃতে। শহরের নান্দনিক ঈদ আয়োজন আর পুরো রোজার মাসব্যাপী শপিংমলে যাওয়ার কালচার তখনও আমাদের ওখানে পৌঁছেনি। অর্থনৈতিক নানা টানাপোড়েন আর চাওয়া পাওয়ার সীমাবদ্ধতার মাঝেও ঈদ গুলো ছিল সত্যিকারের উৎসবে ভরপুর।

ঈদের আগের সন্ধ্যায় চাঁদ দেখার জন্য অপেক্ষা করতাম। মাগরিবের নামাজের পর দল বেধে পশ্চিম আকাশ পানে অপলক তাকিয়ে থাকা। কে আগে দেখবে তার এক ধরনের প্রতিযোগিতা থাকতো ছেলে-বুড়ো সকলের মধ্যে। যে প্রথম দেখতো সে চাঁদদদদ.... বলে চিৎকার দিয়ে উঠতেন। পরবর্তীতে সে অন্যদের দেখাতো। ইতিমধ্যে অন্য বাড়ি থেকে চাঁদদদ.... শব্দ আসা শুরু হত। একটুকরো ক্ষনস্থায়ী চাঁদ নিয়ে কত রকম বিশ্লেষণ। কোন দিকে বেঁকে উঠেছে, বেশি চিকন কিনা! চাঁদ বাঁকানো দিকের সাথে বাজারদরের কী সম্পর্ক ছিল, সে প্রশ্নের উত্তর আজও পাইনি। তবুও খুশির বারতা নিয়ে চাঁদ উঠতো আকাশে। মনের আকাশে সুখের হিল্লোল বয়ে যেত।

বাড়িতে তখন সাত ঘর। ঈদের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতাম। চারদিকে তখনও অন্ধকার। মা চাচীরা রাত থেকেই কাজ শুরু করতেন। রান্না ঘরের খলবা বা পাতার বেড়ার ফাঁকে আসা কুপির আলো তা জানান দিত।কোন কোন ঘরে ফজরের আগেই ফিরনি রান্না শেষ হত। একটা প্রতিযোগিতা থাকত কোন ঘর আগে খাওয়াতে পারে। কোন ঘরে রান্না শেষ হলেই ডাক পরত সবার। ফজরের নামাজের আগেই কোন কোন ঘরে রান্না হয়ে গেলে সমবয়সী চাচাতো ভাইদের ডাক পরতো। দলবেধেঁ ফজরের নামাজ পড়ে এ ঘর ওঘরে গিয়ে ফিন্নি খেতাম। সকল ঘরেই সেমাই আর পায়েস রান্না হত। কোন কোন ঘরে লালাভ ধরনের ফিন্নি দেয়া হত। তা ছিল গুড়ের তৈরী, যা অবস্থাসম্পন্ন ঘরের মানুষরা খায় না (!)। খেজুরের গুড়ের সহজলভ্যতা আর মূল্য কম থাকাতে কেউ কেউ গুড়ের ফিন্নি করতো কিছুটা ব্যয় কমাতে। আম্মা সর্বদা চাইতেন চাচাতো ভাইদের বহরের প্রথম আয়োজনটা যেন আমাদের ঘরেই হয়। বাড়ির চাচাত ভাইবোনরা আম্মাকে মা বলেই জানতেন। দু একজন আম্মা ডাকত। খাওয়া শেষে ছোট মানুষ বড় দায়িত্ব পালন করতাম। দলবেঁধে আসা গরীবদের ফিতরা দেওয়ার কাজটা করতে হত আমাকে। বাড়িতে প্রায় প্রত্যেককে থালা ভরে সিন্নি(পায়েস) খাওয়ানো হত। আর দু চার টাকা করে ফিতরা দেয়া হত। ঈদের দুই তিন আগে আব্বা ফিতরা হিসেব করে খুচরা টাকা আম্মার কাছে দিতেন আর আমি সকাল বেলায় আসা লোকদের মাঝে বিতরণ করতাম। বেশ কয়েক বছর ধরে আম্মা রোজার প্রথমদিকে যাকাত আর ফিতরার টাকা হিসেব করে বুঝে নিতেন যাতে রোজার মধ্যেই আশপাশের গরিবদের মধ্যে সামান্য টাকা পয়সা পৌঁছে দিতে পারেন। এখন আর ঈদের দিন কোন ফকির পায়েস খেতে অন্যের বাড়ি আসে না, ফিতরা তারা আগেই নিয়ে নেয়। ইদানিং খুব ইচ্ছে করে সে সময়ের মত গরীব মানুষদেরকে একটু ফিন্নি পায়েস খাওয়াই ঈদের দিন কিন্তু তাদের পাওয়া দুষ্কর। এ এক পজেটিভ পরিবর্তন সমাজের, আমাদের দৃৃৃশ্যমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রমান।

একটু পরেই শুরু হত আব্বার কমন ডায়লগ " গোছল কর, নামাজ পাবি না।"দলবেঁধে সবাই পুকুরের ঘাটে গোছলে যেতাম। নতুন সাবানের প্যাকেট খুলে দীর্ঘ সময়ের গোছল। ইতোমধ্যে সাতারের নামে পানি ঘোলা করলে বড়দের কেউ এসে আমাদের উঠিয়ে দিত পুকুর থেকে।

সালামী হিসেবে ৫/১০ টাকার কচকচে নোটের সেই প্রাপ্তির উম্মাদনা আর কোন দিন ফিরে আসবেনা। মাধ্যমিক স্কুলের মধ্য ক্লাসে পড়ার সময় থেকে ঈদের নামাজের পর সিনেমা দেখা ছিল নিত্য রুটিন। ঈদের বেশ কয়েকদিন আগেই জেনে নিতাম কোন সিনেমা আসছে আর নায়ক নায়িকাইবা কে? রেডিওর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই সিনেমা সম্পর্কে ধারণা নিয়ে রাখতাম। ঐ দিন সকালের শোতে টিকিট পাওয়া বেশ দুষ্কর থাকলেও আমাদের রুখতে পারে, সেই সাধ্য কার! অনেক মানুষের ভীড়ে টিকিট কেটে কিংবা কালোবাজারীর হাত থেকে টিকিট নিয়ে প্রচন্ড ভীড় ঠেলে হলে ঢুকে দেখতাম, জাতীয় পতাকা দেখাচ্ছে আর বাজছে জাতীয় সংগীত। প্রত্যেক দর্শক জাতীয় পতাকার সম্মানার্থে দাড়িয়ে থাকতো।

দুপুরে পুকুরে মাছ ধরা ছিল অন্যতম আনন্দের মাধ্যম। বড়রা প্রায় সকলেই জাল নিয়ে পুকুরে নামতেন। ছোটরা মাছ আনা নেওয়ার কাজ করতাম। কোন জালে বড় মাছ পরলে সমস্বরে চিৎকার দিয়ে উঠতাম। অনেকগুলো বড় মাছ উঠানে জড়ো করে ভাগ করা হতো। দুপুরে দাদা, আব্বা, আমি একত্রে খেতে বসতাম। পোলাও, ডিমের কোর্মা, মুরগী আর মাছই থাকতো প্রধানত। পোলাও সে সময় অল্প পরিমানে পরিবেশনার রেওয়াজ ছিল। এমনকি বিয়ে বাড়িতেও প্লেটের মাঝ বরাবর ছোট বাটি সমপরিমাণ পোলাও পরিবেশন করা হতো। আমার অবশ্য পোলাও খাওয়ার ভিন্ন গল্প আছে। আমি তখন বেশ ছোট। আব্বার সাথে তার এক বন্ধুর বাড়িতে খেতে বসেছি। ভদ্রলোক বেশ বনেদী। আমাকে বলল, তুমি আর পোলাও নিবা? আমি নাকি উত্তর দিয়েছিলাম, 'আমাদের ঘরে যেদিন পোলাও রান্না হয়, আমি সেদিন সাদা ভাত খাই না'। আব্বা এবং ঐ ভদ্রলোক আমি বড় হওয়ার পর এ কথাটি প্রায়ই বলতেন।

বিকেলটা চলে যেত মাঠে কাদামাটিতে একাকার হয়ে হাডুডু কিংবা ফুটবল খেলার নামে। সন্ধ্যার আগেই পুকুরে নেমে দল বেঁধে সাতার কেঁটে সময় পার করতাম। কিছু সময় পরে রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে কাচারি ঘরের আড্ডা কিংবা রেডিও নাটক দেখে(সে সময় নাটক শোনা দেখার মতই উপভোগ্য ছিল) সময় পার করতাম।

দাদা পরপারে চলে গেছেন অনেক বছর হল। আম্মাও নেই। আব্বা বয়সের ভারে কিংবা সময়ের অনিবার্য বাস্তবতায় ম্লান হয়েছেন খানিকটা। আমিও স্ত্রী,পুত্র, আত্মীয় আর সমাজের প্রয়োজনে ভিন্ন মানুষ। দায়িত্বের বোঝা বহনও জীবনের একধরনের বাস্তবতা, প্রশান্তিও বটে। বেশতো চলছে জীবন। হাসি -কান্না, প্রাপ্তি- অপ্রাপ্তির জীবনে আবর্তিত হচ্ছি ইচ্ছা- অনিচ্ছায়, হতাশা- ব্যর্থতায়। তবুও কেঁটে যাচ্ছে জীবন, বেশ কাটছে।

( ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত)

একাত্তর কন্ঠ 


আপনার মন্তব্য লিখুন...

সত্য প্রকাশে নির্ভীককণ্ঠ
Top